ভূমিকা: কিছু গল্প আমাদের মনের গভীরে এমনভাবে গেঁথে যায় যা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। যখন অন্ধকার নামে আর চারপাশে নিস্তব্ধতা গ্রাস করে, তখনই যেন দানা বাঁধে অজানা ভয়। আজ আমি আপনাদের শোনাব নাবিলা ও সাদিয়া নামের দুই বোনের জীবনের এক হাড়হিম করা সত্য ঘটনা।
গল্পের শুরু : সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল, আর রাত বাড়ার সাথে সাথে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। শহরের এক প্রান্তে পুরনো এক বিশাল বাড়িতে নাবিলা আর তার ছোট বোন সাদিয়া তখন একা। বাবা-মা জরুরি প্রয়োজনে পাশের গ্রামে গিয়েছেন, ফিরতে ফিরতে ভোর হবে।
বিদ্যুৎ নেই চারদিকে, নিকষ কালো অন্ধকার। নাবিলা তার ল্যাপটপে অফিসের জরুরি কাজ শেষ করছিল, আর ছোট বোন সাদিয়া পাশের ঘরে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছিল। সাদিয়া একটু ভীতু স্বভাবের, তাই নাবিলা বারবার তাকে আশ্বস্ত করছিল যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
রাত তখন আনুমানিক ১২টা ৪৫ মিনিট। হঠাৎ করেই একটা বিকট শব্দে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল। শব্দটা যেন দোতলার সেই পুরনো বন্ধ ঘরটা থেকে এল।
অজানা পায়ের শব্দ : নাবিলা টর্চ জ্বালিয়ে সাদিয়ার ঘরে গেল। দেখল সাদিয়া ভয়ে কুঁকড়ে বিছানায় বসে আছে। "নাবিলা আপু, তুমি শুনলে? দোতলার সেই ঘর থেকে কীসের যেন একটা শব্দ এল!" সাদিয়া ফিসফিস করে বলল।
নাবিলা সাহস দিয়ে বলল, "হয়তো জানালা খোলা ছিল, বাতাসে পড়ে গেছে। তুই এখানেই বস, আমি একবার দেখে আসছি।"
নাবিলা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে শুরু করল। কাঠের সিঁড়িগুলো প্রতিটি ধাপে 'মড় মড়' শব্দ করছিল। দোতলায় পৌঁছাতেই এক অদ্ভুত ঠান্ডা বাতাস তাকে স্পর্শ করে গেল। ঠিক তখনই নাবিলা শুনতে পেল— "খট... খট... খট..."
শব্দটা সিঁড়ির দিক থেকেই আসছে। কেউ একজন ধীরে ধীরে নিচে নামছে। নাবিলা টর্চের আলো ফেলল, কিন্তু সিঁড়িতে কেউ নেই। অথচ পায়ের শব্দগুলো তার একদম কাছে এসে থেমে গেল।
অন্ধকারে মুখোমুখি : হঠাৎ সাদিয়ার ঘর থেকে একটা আর্তচিৎকার ভেসে এল। নাবিলা পাগলের মতো নিচে দৌড়ে এল। সাদিয়ার ঘরে ঢুকে দেখল সাদিয়া মেঝের এক কোণায় আঙুল দিয়ে ইশারা করছে।
সেখানে কেউ নেই, কিন্তু সাদিয়ার ঘরের আয়নায় নাবিলা যা দেখল, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল। আয়নার প্রতিফলনে দেখা যাচ্ছে, সাদিয়ার ঠিক পেছনেই একটা লম্বা, ফ্যাকাশে ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তার চুলগুলো মেঝে পর্যন্ত লম্বা, আর তার চোখ দুটো থেকে টকটকে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
মূর্তিটি ধীরে ধীরে সাদিয়ার কাঁধে হাত রাখতে গেল। নাবিলা চিৎকার করে সাদিয়ার হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারা বাড়ির সদর দরজার দিকে দৌড় দিল, কিন্তু দরজাটা যেন ভেতর থেকে কেউ অদৃশ্য শক্তিতে আটকে রেখেছে।
পেছন থেকে একটা খসখসে অস্পষ্ট গলা ভেসে এল—"তোমরা কোথায় যাচ্ছ? খেলা তো কেবল শুরু..."
ভোরের আলো ও রহস্য :পরদিন সকালে বাবা-মা যখন বাড়ি ফিরলেন, তারা দেখলেন নাবিলা ও সাদিয়া ড্রইংরুমে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। সারা বাড়িতে ধূপের মতো একটা তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে ছিল।
সাদিয়ার জ্ঞান ফিরলে সে লক্ষ্য করল, তার হাতের পুতুলটির গলা কেউ মটকে দিয়েছে, যা সে রাতে তার বিছানায় রেখেছিল। আর নাবিলার ল্যাপটপের স্ক্রিনে বড় বড় করে লেখা ছিল—"আবার দেখা হবে।"
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সেই পুরনো তালাবদ্ধ ঘরের ভেতরে ধুলোয় ঢাকা মেঝের ওপর দুটি মানুষের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল, যা কিছুক্ষণ আগেই কেউ হেঁটে গেছে বলে মনে হয়। অথচ ঘরটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধই ছিল।
নাবিলা ও সাদিয়া আজও সেই রাতটির কথা মনে করলে শিউরে ওঠে। তারা বুঝতে পেরেছে, সেই বাড়িতে তারা একা ছিল না; ছায়ার আড়ালে কেউ একজন সবসময় তাদের ওপর নজর রাখছিল।
No comments